লালমোহনে দরপত্রের আগেই শত শত গাছ কাটার অভিযোগ, বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকা
ভোলার লালমোহনে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজকে কেন্দ্র করে দরপত্র ও প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই চার শতাধিক সরকারি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রমাগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন ও তাঁর সহযোগী মাসুম বিল্লাহর নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, কেটে নেওয়া গাছগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। তবে গাছ কাটার প্রকৃত সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার কর্তারহাট থেকে রমাগঞ্জ ইউনিয়নের রায়চাঁদ বাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের রেইনট্রি, মেহগনি ও চাম্বুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। কাটা গাছের একটি বড় অংশ রাতের আঁধারে কাভার্ড ভ্যানে করে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কিছু গাছ স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, গাছ কাটার চিহ্ন আড়াল করতে কোনো কোনো গাছের গোড়া সড়ক প্রশস্তকরণের কাজে ব্যবহৃত মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কিছু গাছ গোড়াসহ উপড়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
২৪টি গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উদ্যোগে কর্তারহাট থেকে রমাগঞ্জ ইউনিয়নের রায়চাঁদ বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। এ কাজে সড়কের পাশের কিছু গাছ অপসারণের প্রয়োজন দেখা দিলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে কাটার উপযোগী গাছের সংখ্যা ও সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দেন।
উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সরেজমিন পরিদর্শন করে ২৪টি গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হয়। পরে গাছগুলোর টেন্ডারমূল্য হিসাব করে ইউএনওর কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে গাছগুলো বন বিভাগের মালিকানাধীন নয় বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, মাসুম বিল্লাহর দাবি, কর্তারহাট-রমাগঞ্জ সড়কের পাশের ৪৮টি গাছ ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় দরপত্রের মাধ্যমে পেয়েছেন তাঁরা। তাঁর ভাষ্য, ওই গাছগুলোই তাঁরা কাটছেন। তবে দরপত্রের নথি ও অনুমোদন-সংক্রান্ত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের চার শতাধিক গাছ কাটার অভিযোগ, রেঞ্জ কর্মকর্তার নির্ধারণ করা ২৪টি গাছ এবং মাসুম বিল্লাহর দাবি করা ৪৮টি গাছের হিসাবের মধ্যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কতটি গাছ কাটা হয়েছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় সেগুলো কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শ্রমিক দিয়ে গাছ কাটানোর কথা স্বীকার স-মিল মালিকের
স্থানীয় স-মিল মালিক মো. মনিরের বিরুদ্ধেও গাছ কাটা ও বিক্রিতে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। তবে তিনি নিজে গাছ কাটেননি বলে দাবি করেছেন।
মনির বলেন, রমাগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদল নেতা জসিম মাস্টার ও মাসুম বিল্লাহর কথামতো তিনি গাছ কাটার শ্রমিক ঠিক করে দিয়েছিলেন।
গাছ কাটার শ্রমিক মো. মামুন বলেন, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি গাছ কাটার কাজ করেন। জসিম মাস্টারের নির্দেশে কর্তারহাট-রমাগঞ্জ সড়কের পাশ থেকে গাছ কেটেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুবদল নেতা মো. জসিম উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়া অসম্পন্ন
সড়কের পাশের গাছগুলোর মালিকানা নিয়ে জটিলতার কথা জানিয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, গাছগুলোর মালিকানা নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সড়কের পাশে গাছ কাটার বিষয়টি তিনি জানেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবহিত করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিফাত বিন সাদেক বলেন, গাছ কাটার অনুমোদন ও দরপত্র-সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী একটি গাছ কাটলে পাঁচটি গাছ রোপণের নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ১০ থেকে ১২ দিন আগে সড়কের পাশ থেকে গাছ কেটে নেওয়ার বিষয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কাটার বিষয়টি প্রশাসনকে জানানোর পরও সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে গাছ কাটা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, মাত্র ২৪টি গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণের পর কীভাবে ৪৮টি গাছের দরপত্র পাওয়ার দাবি উঠল? আর চার শতাধিক গাছ কাটার অভিযোগের সত্যতা থাকলে সেগুলোর হিসাব কোথায়?
গাছগুলোর প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ, দরপত্র ও অনুমোদন-সংক্রান্ত নথি যাচাই এবং কেটে নেওয়া গাছের সংখ্যা ও বিক্রির তথ্য উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে অবৈধভাবে গাছ কাটা হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবশিষ্ট গাছ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

আপনার মতামত লিখুন