মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি প্রবাসী অধিকার পরিষদের
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার খবরে লাখো কর্মপ্রত্যাশী বাংলাদেশি ও তাদের পরিবারের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ২০২২ সালের মতো ২০২৬ সালেও নির্দিষ্ট ২৫টি এজেন্সির একটি সিন্ডিকেট এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে যাচ্ছে।
২০১৬ সালে ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হয়ে ২০১৮ সালে বন্ধ হয়। ২০২২ সালে ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে পুনরায় চালু হয়ে পরে এজেন্সির সংখ্যা ১০১টিতে উন্নীত হয়। অনিয়ম ও উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের অভিযোগের মধ্যে ২০২৪ সালে আবারও বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। অতীতের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ধরনের অস্বচ্ছ, একচেটিয়া ও সীমিত এজেন্সিনির্ভর ব্যবস্থা আবার চালু করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রতি এজেন্সি থেকে ১৭ কোটি টাকা এবং কর্মীপ্রতি ৫ হাজার রিঙ্গিত নেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আগেরবার সিন্ডিকেটের রেট প্রায় ৫ কোটি টাকা থাকলেও এবার তা বেড়ে ১৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপরই পড়বে। সিন্ডিকেটের কারণে একজন শ্রমিককে বিদেশ যেতে ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা শ্রমিক শোষণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব; অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ প্রবাসী অধিকার পরিষদের পরিস্কার অবস্থান:
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিকট দল, নেতা, এমপি, ব্যবসায়ী, দালালচক্র কিংবা টটট ২৫, ৫০ বা ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। নতুন কোনো সিন্ডিকেট গঠন করে কর্মীদের জিম্মি করা যাবে না। কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দালালি, চাঁদাবাজি, কমিশন-বাণিজ্য, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
আমরা দাবি জানাই, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না দিয়ে সরকারিভাবে জি-টু-জি (G2G) ও BOESL ব্যবস্থায় এবং দেশের সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য স্বচ্ছ, উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও সমান সুযোগে চালু করতে হবে। এজেন্সি বাছাইয়ে সবার জন্য সমান নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
কর্মীদের কাছ থেকে কোনোভাবেই অযৌক্তিক অর্থ নেওয়া যাবে না। একজন কর্মীর মালয়েশিয়া যেতে মোট অভিবাসন ব্যয় সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার মধ্যে রাখার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কর্মীপ্রতি মোট ব্যয়, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ, ভিসা/প্রসেসিং/মেডিকেল/টিকিটসহ প্রতিটি খাতের ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থের বিনিময় কিংবা প্রভাব-তদবিরের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অতীতে অনিয়মের কারণে হাজার হাজার কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।
আমাদের স্পষ্ট দাবি:
– মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না দিয়ে সরকারিভাবে জি-টু-জি (G2G) ও BOESL ব্যবস্থায় এবং দেশের সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান ও উন্মুক্ত সুযোগ চাই।
– কর্মীপ্রতি সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার মধ্যে অভিবাসন ব্যয় চাই।
– কোনো দালালি, চাঁদাবাজি বা কমিশন বাণিজ্য নয়।
– প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সরকারি নজরদারি চাই।
সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান:
সিন্ডিকেট বন্ধ করুন। দালালি বন্ধ করুন। চাঁদাবাজি বন্ধ করুন। কর্মীদের জিম্মি করা বন্ধ করুন। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।
প্রবাসীদের ঘাম ও কষ্টের টাকা দিয়ে কোনো সিন্ডিকেটকে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে আবারও কিছু মানুষের লুটপাটের বাজারে পরিণত করার চেষ্টা করা হলে বাংলাদেশ প্রবাসী অধিকার পরিষদ নীরব থাকবে না। কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সিন্ডিকেট গঠন কিংবা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা জনগণ ও প্রবাসীদের নিয়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হব।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হবে কর্মীদের জন্য—কোনো সিন্ডিকেটের জন্য নয়। প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ প্রবাসী অধিকার পরিষদ আপসহীন।
দেশজামানা/ পিবি

আপনার মতামত লিখুন