বাংলাদেশে উর্দূর প্রতি অন্যায়: ইতিহাসকে কি আমরা রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার করেছি?
বাংলাদেশের ভাষার ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংবেদনশীলতার নামে কি আমরা ইতিহাসের একটি অংশকে মুছে ফেলছি?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—এ নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। বাংলা আমাদের ভাষা, আমাদের আত্মপরিচয় এবং ৫২ ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় উত্তরাধিকার। কিন্তু বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অর্থ কি এই যে, এই ভূখণ্ডে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী অন্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে আমরা অস্বীকার করব?
আমার প্রশ্ন এখানেই।
উর্দূকে শুধুমাত্র ‘পাকিস্তানি ভাষা’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা ঐতিহাসিকভাবে সরলীকৃত এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে উর্দূ ভাষার বিকাশ ঘটেছে। এই ভাষার সঙ্গে দিল্লি, লখনৌ, হায়দরাবাদ কিংবা লাহোরের যেমন সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি বাংলার সঙ্গেও রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক।
বাংলার নবাবি আমল, জমিদারি সমাজ এবং মুসলিম অভিজাত পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ফারসি ও উর্দূর ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। ঢাকার নবাব পরিবার এবং পুরান ঢাকার আদিবাসী উর্দূভাষী জনগোষ্ঠী তার বাস্তব উদাহরণ। তাদের পূর্বপুরুষেরা এই ভূখণ্ডেই বসবাস করেছেন, এখানেই ব্যবসা করেছেন, সাহিত্যচর্চা করেছেন এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো—তাদের ভাষা কি কেবল পাকিস্তানের ভাষা ? অবশ্যই নয়।
একটি ভাষাকে তার ব্যবহারকারীর রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা ইতিহাসের প্রতি অন্যায়। ইংরেজি ব্রিটিশদের ভাষা ছিল বলে কি আমরা ইংরেজি সাহিত্য, বিজ্ঞান বা জ্ঞানচর্চা প্রত্যাখ্যান করি? আরবি মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ভাষা বলে কি অমুসলিমরা আরবি শিখতে পারে না? ফারসি একসময় প্রশাসন ও সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ভাষা ছিল বলে কি তার ঐতিহ্য অস্বীকার করা যায়?
তাহলে উর্দূর ক্ষেত্রে এত রাজনৈতিক বিচার কেন?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উর্দূ আরবি ভাষা নয়। এটি মূলত একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যা ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের বহুভাষিক পরিবেশে বিকশিত হয়েছে এবং আরবি-ফারসি লিপি ও শব্দভাণ্ডারের গভীর প্রভাব গ্রহণ করেছে। মুসলিম সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার কারণে উর্দূ বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করলেও এর শিকড়কে শুধু পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা ইতিহাসের জটিলতাকে অস্বীকার করা।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—১৯৪৭-এর পাকিস্তান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সংঘাতের ছায়া ভাষার ওপরও পড়েছে।
পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যায়, বৈষম্য ও বাঙালির ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমাদের ক্ষোভ যৌক্তিক ছিল। কিন্তু সেই রাজনৈতিক ক্ষোভ যদি উর্দূ ভাষা, উর্দূ সাহিত্য কিংবা উর্দূভাষী সাধারণ মানুষের ওপরও প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেটি ন্যায়বিচার নয়; বরং এক ধরনের ভাষাগত প্রতিক্রিয়াশীলতা।
একজন উর্দূভাষী বাংলাদেশের নাগরিকের অপরাধ কী? তার অপরাধ কি শুধু তার মাতৃভাষা?
একজন পুরান ঢাকাইয়া উর্দূভাষীর পূর্বপুরুষ যদি শত বছর ধরে এই শহরে বসবাস করে থাকেন, তাহলে তাকে কেন ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখা হবে?
রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব কি মাতৃভাষা দিয়ে নির্ধারিত হয়?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে ভাষার কারণে কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার সংকুচিত করার নৈতিক ভিত্তিও থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের সৌন্দর্য তার বহুত্বে। বাংলা, চাকমা, মারমা, সাঁওতালি, গারো, মণিপুরি, উর্দূসহ বহু ভাষা ও সংস্কৃতি এই দেশের সামাজিক বাস্তবতার অংশ। বাংলা রাষ্ট্রভাষা—কিন্তু রাষ্ট্রভাষা হওয়া অন্য ভাষাগুলোর অস্তিত্ব অস্বীকার করার লাইসেন্স নয়।
বরং একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি তার নিজের ভাষাকে ভালোবেসে অন্যের ভাষাকেও সম্মান করতে পারে।
আমরা যদি সত্যিই ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করি, তাহলে সেই চেতনার মূল শিক্ষা হওয়া উচিত—ভাষার অধিকার। শুধু আমার ভাষার অধিকার নয়, অন্যের ভাষার অধিকারও।
রাজনৈতিক ইতিহাসের সুবিধাজনক অংশ মনে রেখে আর অসুবিধাজনক অংশ ভুলে গিয়ে কোনো জাতি পরিপূর্ণ ইতিহাস নির্মাণ করতে পারে না। পাকিস্তানের রাজনৈতিক অন্যায়ের দায় উর্দূ ভাষার ওপর চাপানো যেমন অন্যায়, তেমনি উর্দূভাষী বাংলাদেশের নাগরিকদের ইতিহাসকে অস্বীকার করাও অন্যায়।
বাংলাদেশকে যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে আমাদের ভাষানীতিতেও সেই উদারতার প্রতিফলন থাকতে হবে।
বাংলাকে ভালোবাসুন, বাংলাকে মর্যাদা দিন—কিন্তু অন্যের ভাষাকে ঘৃণা করে নয়।
কারণ ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কোনো ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
আর ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসই আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।
উর্দূ বাংলাদেশের শত্রু নয়। উর্দূভাষী মানুষও বাংলাদেশের শত্রু নয়। ইতিহাসকে বিকৃত করাই বরং আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।
লেখক: সংগঠক ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব


আপনার মতামত লিখুন