বেইমানির রাজনীতি ও ক্ষমতার লোভ: ইতিহাসের আয়নায় এনসিপি
ক্ষমতার লোভ, চরম সুবিধাবাদ আর বেইমানির পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে—তা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে আরও একবার হাতেনাতে প্রমাণিত হলো। আমরা কি এত দ্রুত ভুলে গেলাম ২৪-এর সেই রক্তঝরা জুলাইয়ের দিনগুলোর কথা?
যখন রাজপথ তপ্ত ছিল, বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে আন্দোলনের সিংহভাগ নেতৃত্ব দিয়েছিল ছাত্র অধিকার পরিষদ কিন্তু বিজয়ের সূর্য উদয় হতে না হতেই শুরু হলো ক্ষমতার ভাগাভাগি আর চরম নোংরা ‘মাইনাস পলিটিক্স’। আন্দোলনের আসল কারিগরদের লাতি মেরে সরিয়ে, তাদের ত্যাগকে অস্বীকার করে রাতারাতি ক্ষমতার মঞ্চ এককভাবে দখল করতে নামলো এনসিপি।
আপামর জনতার আস্থা-বিশ্বাস ও ভরসার একমাত্র অরাজনৈতিক প্লাটফর্ম “বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন” জুলাই পরবর্তী কমিটি-কে পরোক্ষভাবে তাদের দখলে নিয়ে নিল। যাদেরকে উপস্থাপন করা হতো নিরপেক্ষ। তাদের এক্সেস ছিলো প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু ভিতরগত তারাই এনসিপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেছিল। এনসিপির সবচেয়ে বড় সহায়ক ছিল ইন্টেরিম। যার কারনে ইন্টেরিম তাদের নিরপেক্ষতা হারিয়েছিলো। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে ব্যার্থ হয়েছিল।সর্বশেষ রাষ্ট্রের হ…মেরে বিপ্লবীদের জীবন হুমকির মুখে ফেলে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধরে রেখে দাড়ঁ করাল কিংস পার্টি!
প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয় না। বিশেষ করে বেইমানদের তো কখনোই নয়! অন্যের জন্য যে গর্ত তারা খুঁড়েছিল, আজ এনসিপি নিজেই সেই গর্তে গিয়ে আছাড় খেয়েছে। যে নোংরা খেলা তারা শুরু করেছিল, আজ তারা নিজেরাই সেই ‘মাইনাস রাজনীতির’ নির্মম বলি। একেই বলে জুতো মেরে গরু দান, কিংবা থুথু ছিটালে তা নিজের গায়েই ফিরে আসা!
এখন যদি আমরা একটু ঠাণ্ডা মাথায় এই পুরো ক্ষমতার সমীকরণটি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করি, তবে ইতিহাসের একটি ভয়ানক ও সমান্তরাল মিল আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এনসিপির রাজনীতি এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগের রাজনীতির মনস্তত্ত্ব ও কৌশলের মধ্যে এক অদ্ভুত ও নিখুঁত ঐতিহাসিক মিল রয়েছে।
জাতীয় অর্জনকে একক সম্পদ মনে করা:
১৯৭১ সালে সর্বস্তরের মানুষ, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, ডান/বামপন্থী দলসমূহ মা-বোনদের ইজ্জত এবং সাধারণ ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ পুরো মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের ‘একক সম্পত্তি’ বানিয়ে ফেলে। যারা তাদের দলীয় মতাদর্শের বাইরে ছিল, তাদের অবদানকে মুছে দিয়ে একদলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থার দিকে দেশ নিয়ে যাওয়া হয়।
ঠিক একই চিত্র দেখা গেল ২০২৪-এর জুলাই পরবর্তী সময়ে। সাধারণ ছাত্র-জনতা এবং ছাত্র অধিকার পরিষদ-ছাত্র শিবির-ছাত্রদল-ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন’র মতো প্রথম সারির মাঠের যোদ্ধাদের রক্ত ও ত্যাগের ওপর ভর করে ফ্যাসিবাদের পতন হলো। অথচ ক্ষমতা ও কৃতিত্বের পুরো চামচামি একা কুক্ষিগত করতে চাইল এনসিপি। জুলাইয়ের গণআকাঙ্ক্ষাকে তারা একটি নির্দিষ্ট দলীয় ফ্রেমওয়ার্কে বন্দি করে ফেলেছিল। মায়নাস পড়লো গণঅধিকার পরিষদ-বিএনপি-জামাতসহ অন্যান্য দলের রক্তে গাথা ইতিহাস।
আওয়ামী লীগ যেমন মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে পড়েছিল, এনসিপির ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। জুলাই বিপ্লবের বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের চেতনা বুকে না রেখে তারা রাতারাতি সস্তা রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সুবিধাবাদী জোটের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে ত্যাগী ও নীতিবান নেতারা তাদের ত্যাগ করতে শুরু করে এবং দলটির নৈতিক ভিত্তি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা অন্যায্য ও অগণতান্ত্রিক উপায়ে সহযোদ্ধাদের মাইনাস করে এবং গণমানুষের যৌথ অর্জনকে এককভাবে কুক্ষিগত করে টিকে থাকতে চায়, তারা দীর্ঘমেয়াদে কখনোই সফল হতে পারে না। আওয়ামী লীগ ‘৭১-কে কুক্ষিগত করে দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের পর যেভাবে ইতিহাসের আর্বজনায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে, এনসিপিও ‘জুলাইকে’ কুক্ষিগত করতে গিয়ে অতি দ্রুতই একই মাইনাস রাজনীতির নির্মম শিকারে পরিণত হলো।
বর্তমান বিএনপিও যদি জুলাইয়ের প্রকৃত যোদ্ধাদের বাদ দিয়ে নিজেদের মতো ইতিহাস রচনা করতে চায় তবে এদের পরিনাম কি হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই জানেন!
সুতরাং যার যার অবদান স্বীকার করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে আমাদের ঐক্যবদ্ধতা একান্ত প্রয়োজন।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা ছাত্র অধিকার পরিষদ, সিলেট জেলা।


আপনার মতামত লিখুন