ছড়ার ‘মুগুর’ ছড়াকার মাহফুজ ইকরাম
মুগুর কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষকবান্ধব একটি কৃষিযন্ত্র। অধুনা বিলুপ্তও বলা যায়। সাহিত্যে মুগুর প্রবাদপ্রতিম শব্দও বটে। ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’ প্রবাদের সাথে কমবেশি পরিচিত আমরা। সম্প্রতি ‘মুগুর’ নামে প্রকাশিত হয়েছে একটি বই। বইটি তারুণ্যদ্বীপ্ত ছড়াকার মাহফুজ ইকরাম এর প্রথম ছড়াগ্রন্থ। অসৎ, অন্যায়কারী, জালেম, দুর্নীতিবাজ, বদমায়েশের জন্য হাতে নিয়ে এসেছেন ছড়ার শব্দ ‘মুগুর’। ৫৬ টি মুগুর ছড়ায় গ্রন্থিত একটি বই। এছাড়াও আছে উৎসর্গপত্র ও ফ্ল্যাপে দুটো ছড়া। সবগুলো ছড়ার গতি সাবলীল, বক্তব্য স্পষ্ট। আছে ছন্দ, তাল, লয়, মাত্রায় সচেতনতার ছাপ। ২০২২ এর ডিসেম্বরে প্রকাশ ঘটেছে ‘মুগুর’ নামক বইটির।
আত্মোপলব্ধি মানুষের শুদ্ধতার সম্পদ। যে নিজেকে চিহ্নিত করতে পারে সে সাধারণের মাঝে হয়ে ওঠে অসাধারণ। মনের ভিতর গোপন পশু দ্বারা তখন সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। ছড়াকার মাহফুজ ইকরাম জানেন মনের পশুর স্বভাব কী, কি করতে পারে সে। এটি তিনি শুধু নিজে জেনেই চুপ থাকেননি। অন্যদেরও সজাগ করে দিতে লিখেন- ‘আমার মনের গহিন বনে/ একটা পশুর বাস/ এই পশুটাই নিত্য আমার / ঘটায় সর্বনাশ। ( মনের পশু)’।
যুগে যুগে কিংবা শতাব্দীর কোন এক সময় হঠাৎ হঠাৎ আসে মহামারি। মহামরি পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়। নিকটতম সময়ে পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে করোনা মহামারি। হৃদয়ে দাগ কেটেছে সচেতন মানব মাত্রই। একজন ছড়াকারের হৃদয়ের উত্তাপে তা প্রকাশ করেছেন নিজের ছড়াগ্রন্থে। মাহফুজ ইকরাম লিখেন- ‘দেশজুড়ে মহামারি করোনার ভয়/ সকলেই শঙ্কিত কী জানি কী হয়!/পথেঘাটে স্বাভাবিক যায় নাতো চলা/ নিষিদ্ধ সমাগম জনতার দলা। (লকডাউন)’। দলা নিয়ে মাহফুজ ইকরামের বিপক্ষে আঙুল তুলতেই পারে কেউ। অন্তমিলের জন্য জনতার দলকে দলা করেছেন। মাহফুজ ইকরাম ছন্দ সচেতন। ছড়ায় পারঙ্গম। দলার প্রায়োগিক বিবেচনার দাবি রাখে। জনতার দলা হয়তো বেমানান। মাহফুজ ইকরাম অন্ত্যমিলের প্রশ্নাতীত শব্দ নিয়ে আসতে পারতেন। তিনি চেষ্টা করলে পারতেন। এটি তার জন্য জটিল কিছু ছিল না।
শব্দের কিছু চমৎকার প্রয়োগ ছড়াকারের ছন্দজ্ঞান, শব্দ চয়ন, দক্ষতা, ভাব প্রকাশের মুন্সিয়ানা প্রকাশ পায় দারুণভাবে। ‘সবুজাভ প্রকৃতির কী দারুণ লুক ছিল!/সব মিলে বাঙালির আহা! কত সুখ ছিল। (আহা! কত সুখ ছিল)।’ ছড়াকারের হয়তো জানা আছে বাঙালি বলতে বুঝায় ভাষাভিত্তিক পরিচয়। বাঙালি বলতে বাংলা ভাষাভাষী সবাই। আর বাংলাদেশী বলতে মানচিত্রগত পরিচয়। বাংলাদেশী বলতে আমরা বুঝি সমগ্র বাংলাদেশী। বাঙালি বলতে কী সমগ্র বাংলাদেশীকে বুঝায়? বুঝালেও হয়তো এখানে জবরদস্তি কাজ করে। একজন পাহাড়ি বাংলাদেশী। কিন্তু বাঙালী কিনা এটা আলোচনা সাপেক্ষ। কবি, গল্পকার, ছড়াকাররা এসব ছোট ছোট বিষয়ের অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ধার করে সৃজন করবে নিজের সম্ভ্রান্ত রচনা। এই আশা জাতির থাকে সবসময়।
‘দেশের তরে দশের তরে/ সত্য- ন্যায়ের চাষ করে যাই/ মিথ্যাবাদী, বদ হারামির/ গুমরগুলো ফাঁস করে যাই। (কাজের ফাঁকে)। এমন ব্রতে এগিয়ে গেলে ছড়াকারের ছড়া চর্চা হবে দেশ ও দশের পক্ষে কলম লড়াই। এ লড়াই করতে করতে তার সামনে উন্মোচিত হয় চতুর্পাশ। এবং সাহসের সাথে আরও উন্মুক্ত করে দিতে বলেন ‘দুগ্ধ পাঠাই বন্ধুকে আর বন্ধু পাঠায় মদ/ আমার যত বন্ধু আছে সবাই ভীষণ বদ! (ছোবল)।’
আগেই বলেছি মাহফুজ ইকরাম ছন্দ- ছড়ায় প্রাজ্ঞ। প্রাজ্ঞতার অর্জনে ছন্দ অন্তমিলের প্রচলিতের অচলায়তন ভাঙতে অন্ত্যমিলে নতুনত আনত্বে চেষ্টা করেছেন। যদিও এটি নতুন কিছু না। তবু প্রচলিত ধারার ব্যাতিক্রমের প্রচেষ্টা বলা যায়।’ সরকারি মাল, রিলিফ, টিআর/ গরিব- দুখীর হক মেরে খায়,/ বাইরে লাগায় ভালোর খোলস/ তলে তলে ঠক মেরে খায়। (দুর্নীতিবাজ)’। সচরাচর সহজলভ্য অন্ত্যমিল আর গতানুগতিক ধারায় আবর্তিত সমগ্র বইয়ের সবগুলো ছড়া। ছড়ার ভাব, বিষয়, উপস্থাপন পাঠক হৃদয় জয় করতে সক্ষম এবং মাহফুজ ইকরাম একজন দক্ষ ছড়াকার হিসেবে হাজির হয়েছেন এই বইয়ে। এখন তাকে সামনে এগুতে হবে নতুনত্বের অভিযাত্রায়। ছড়ার ভাঙচুর,অন্ত্যমিলের চমৎকারিত্ব, ভাবনার অভিনবত্ব যতবেশি দেখাতে সক্ষম হবে ততবেশি গ্রাহ্য হবেন ছড়ার অঙ্গণে। এই যে আলাপ এসব কিন্তু কোন অভিযোগ না, না কোন পরামর্শ। এসব কেবলই কিছু প্রস্তাবনা। প্রচেষ্টা যে করেননি তাও নয়। চেষ্টার নমুনা রেখেছেন শেষ ছড়ার আগের ছড়ায়। কোন ছড়ায় তা পাঠকের জন্য রয়ে গেল কৌতূহলোদ্দীপক হিসেবে। মূলত মাহফুজ ইকরাম ছড়ায় তুলে ধরেছেন অনিয়ম, অসঙ্গতি, ন্যায় অন্যায়ের চিত্র। প্রকাশ করেছেন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ঘটে যাওয়া জুলুমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ।
মাহফুজ ইকরাম একজন আলেম, একজন ছড়াকার এবং একজন সমাজ সচেতন নাগরিক। তার ছড়ায় আছে বিশ্বাস ও বিপ্লবের মিশ্রণ। মাহফুজ ইকরাম ছড়া অন্তঃপ্রাণ মানুষ। নিরন্তর প্রচেষ্টায় নিজেকে ছড়ায় উজ্জ্বলতর স্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে আশা করি। ‘মুগুর’ তার প্রথম ছড়াগ্রন্থ। প্রথম গ্রন্থেই তিনি রেখেছেন নিজের সক্ষমতার সাক্ষর। বইটির প্রকাশক কিংবদন্তি নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে আছেন দিনার মিনহাজ। ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১৮০ টাকা। পৃষ্ঠা ও বইয়ের নামের মাঝখানের চিহ্নটি দধষ্টিভ্রম কিংবা দৃষ্টিকটু মনে হয়। তার বইটি পৌছে যাক পাঠকের হাতে হাতে। বইটির পরিবেশক বারান্দা, ৩৪ নর্থব্রুক হল রোড (মাদ্রাসা মার্কেট ২য় তলা) বাংলাবাজার, ঢাকা। বইটি পেতে অনলাইন বিক্রয় মাধ্যম বইফেরী, রকমারি ডটকম কিংবা লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
লেখক: তাজ ইসলাম, কবি ও সাহিত্য সমালোচক

আপনার মতামত লিখুন