কলাম
বেশি লম্বা মানুষের বুদ্ধি থাকে হাঁটুতে!
ছাত্র হয়ে শিক্ষকের রাজনীতির বিরোধিতা করার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে- সৈয়দ ফজলুল করিম সাহেব তখন বলেছিলেন, ওস্তাদ যদি ইমামতিতে ভুল করেন, পেছন থেকে ‘লোকমা’ দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। এখানে ছাত্র-শিক্ষক বলে- মেনে নেয়ার কোনো সুযোগ ইসলাম রাখেনি।
শায়খুল হাদিস আজিজুল হক সাহেবকে এক সময় বলা হতো- বাংলাদেশের সকল আলেমদের শিক্ষক। তিনি বোখারী শরীফের অনুবাদক। তিনি কতো উঁচু মাপের আলেম ছিলেন, তা আমার পক্ষে বোঝা কঠিন। কিন্তু তাঁর প্রতি দেশের আলেম-ওলামাদের ভক্তি শ্রদ্ধা দেখে ধারণা করতে পারি, ইলমি গভীরতার দিক থেকে তিনি ছিলেন অনেক উপরের মানুষ।
সুতরাং আলেম আজিজুল হক সাহেব কে নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু রাজনীতিক আজিজুল হক সাহেবকে নিয়ে অনেক কথা আছে।
আজিজুল হক সাহেব ছিলেন, ইসলামী ঐক্য জোটের প্রধান। ছ’টা দল মিলে গঠিত ওই জোট নিয়ে তিনি এবং মুফতি আমিনী সাহেব, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটে যোগ দিয়েছিলেন। তখন দেশের আলেম-ওলামারা প্রকাশ্যে খুব একটা উচ্চ-বাচ্য না করলেও, ই আন্দোলনের মরহুম নেতা এবং আজিজুল হক সাহেবের ছাত্র সৈয়দ ফজলুল করিম সাহেব প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি ইসলামী ঐক্যজোট থেকে তার দল নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
ফজলুল করিম সাহেব বলেছিলেন, ইসলামী ঐক্য জোট গঠিত হয়েছে, ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য। অন্য কারো ক্ষমতার সিড়ি হওয়ার জন্য নয়। তাছাড়া সে সময় বিএনপি’র নেতৃত্বে ছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া। সুতরাং নারী নেতৃত্ব নিয়েও তাঁর ঘোর আপত্তি ছিলো।
ছাত্র হয়ে শিক্ষকের রাজনীতির বিরোধিতা করার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে- সৈয়দ ফজলুল করিম সাহেব তখন বলেছিলেন, ওস্তাদ যদি ইমামতিতে ভুল করেন, পেছন থেকে ‘লোকমা’ দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। এখানে ছাত্র-শিক্ষক বলে- মেনে নেয়ার কোনো সুযোগ ইসলাম রাখেনি।
আজিজুল হক সাহেব তাঁর দল ‘মজলিস’ নিয়ে আউমীলীগের সাথে ঐক্য করেছিলেন। লিখিত চুক্তি করেছিলেন। পরবর্তীতে, ‘সুশীল/প্রগতিশীল’ নামের ফ্যাসিস্টদের চাপে আউমীলীগ সে চুক্তি বাতিল করেছিলো। ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলো মজলিসকে।
আজিজুল হক সাহেব নিজের গোত্র ছেড়ে বা ইসলামপন্থীদের ছেড়ে ভিন্ন আদর্শের বিএনপি এবং আউমীলীগের সাথে ঐক্য করেছিলেন কেনো? যে আদর্শকে তিনি ‘কুফর’ মনে করতেন, সেই আদর্শের সাথে (চতুর্থ নাম্বার দল হিসাবে) জোটবদ্ধ হওয়ার পেছনে- ‘ক্ষমতা’ ছাড়া অন্য কোনো কারণ কি আদৌ ছিলো? যে জামাতকে তিনি ‘মওদুদী ফেতনা’ মনে করতেন, চার দলীয় জোটের মাধ্যমে সেই দলের সাথে মিলেমিশে রাজনীতি করা কি নৈতিকভাবে সঠিক ছিলো?
আজিজুল হক সাহেবের সাত (সম্ভবত) ছেলে। তারা সবাই মেধাবী। তাদের মধ্যে মামুনুল হক দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বেশি পরিচিত। কারণ, তিনি একাধারে রাজনীতিক, ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতের নেতা এবং ৫০১ সেলিব্রিটি (যে ঘোষণা তিনি নিজেই দিয়েছেন)।
মামুনুল হক বেশি পরিচিতি পেয়েছেন ‘৫০১’ কান্ড ঘটিয়ে। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময়ে অদুরদর্শী বাড়াবাড়ি করে- একগাদা মানুষের জীবন ঝরিয়ে ছিলেন। তাদের রক্ত মাড়িয়ে- কথিত স্ত্রীকে নিয়ে রিসোর্টে গিয়েছিলেন ‘আরাম’ করতে। রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে তার ঘরের স্ত্রীকে টেলিফোনে মিথ্যা বলেছিলেন। সেই রেকর্ড এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাসে। ঝরনার সাথে নাকি তার দু’বছরের সম্পর্ক ছিলো। যদি সত্যি হয়, ওই দু’বছর তাকে কতো মিথ্যা কথা বলতে হয়েছে, কতো রকমের ছলচাতুরি করতে হয়েছে পরিবারের সাথে- তা কি আলাদা করে বলার কোনো প্রয়োজন আছে?
সে সময় অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন- এমন অসৎ, প্রকাশ্য মিথ্যাবাদীর কাছ থেকে হাদীসের পাঠ নেয়া কি জায়েজ আছে? তার ইচ্ছাকৃত ‘মিথ্যা’ প্রমাণিত হওয়ার পরে- যারা তার কাছ থেকে ‘সনদ’ নিয়েছে, সেগুলো কি বাতিল হয়ে যায়নি?
এ বিষয়ে আমার জ্ঞানের ঘাটতি আছে, সুতরাং আমার আলোচনা এটা নয়। মামুনুল হকের ইলমি যোগ্যতা- কিদেকি সেটাও নয়। তবে আমি মনে করি, তিনি তার বাবার রাজনৈতিক ‘সিলসিলা’ ধরে রেখেছেন খুব যত্ন করে।
আজিজুল হক সাহেবের সময় থেকে বিএনপি-আউমীলীগসহ দেশের প্রায় সব আদর্শের রাজনৈতিক দলের সাথে ঐক্য করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার দলে। এতো অভিজ্ঞ একটা দল নিয়ে- তিনি কি করছেন? কোন দিকে রওনা করেছেন? ষড়যন্ত্র আর ভোগবাদ ছাড়া সত্যিকারের রাজনীতি তার মধ্যে আছে? সুষ্ঠু রাজনীতির তোয়াক্কা তিনি করেন?
আমি মনে করি, ১১ দলীয় জোট থেকে ই আন্দোলনকে বের করে দেয়ার পেছনের ষড়যন্ত্রে মামুনুল হকও ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে- ই আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা আপন ২ ভাইয়ের মধ্যে ‘ভেজাল’ লাগানোর চেষ্টা করেছেন, এর অকাট্য প্রমাণ আমার কাছে আছে। তিনি ২৪ এর আন্দোলনের সময়ও গণহত্যাকারী আউমীলীগের সাথে বৈঠক করেছেন, মোনাজাত করেছেন, সে ছবিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরঘুর করে।
তিনি খুব নিখুঁতভাবে বিএনপি আউমীলীগের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। হেফাজতের আন্দোলন কে বিপদগামী করেছেন। মুজিবের মূর্তি সরানোর আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে পালিয়ে ছিলেন। ভিডিও বার্তা দিয়ে নতজানু হয়েছিলেন। টেলিভিশনের স্ক্রিনে মুজিব বন্দনা করে জাতে উঠতে চেয়েছন।
আজিজুল হক সাহেবের পরিবারকে দেশের মানুষ মনে করতেন- আলেমদের এলিট পরিবার। সেই পরিবার থেকে উঠে আসা মামুনুল হকের রুচি হলো একজন পার্লার কর্মী! তার কাছে আপনারা আর কি আশা করেন! রুচি দেখেই তো তার দৌড় মাপা যায়।
আমি তাকে বাংলাদেশের কওমিপন্থী রাজনীতির বিষগুল্ম মনে করি! তার কর্মকাণ্ড দেখলে, আমার শুধু ওই প্রবাদটা মনে পড়ে – ‘বেশি লম্বা মানুষের বুদ্ধি থাকে হাঁটুতে’।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট


আপনার মতামত লিখুন