বর্তমান সরকার গঠনের প্রায় সাত মাস অতিক্রান্ত হতে চললো। গণঅধিকার পরিষদ এই সরকারের একটি অন্যতম অংশীদার এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু এই সাত মাসের রাজনৈতিক পথচলায় দলের সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের মনে কিছু মৌলিক ও কঠিন প্রশ্ন জেগেছে, যার উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
১. কর্মীদের ত্যাগ ও প্রাপ্তির ব্যবধান: ছাত্র অধিকার পরিষদের যে তরুণরা তাদের জীবনের সবচাইতে সোনালী ৮টি বছর এই দল প্রতিষ্ঠার পেছনে নিবেদিতভাবে ব্যয় করেছে, যুব অধিকার পরিষদ, শ্রমিক অধিকার পরিষদ এবং প্রবাসী অধিকার পরিষদের যে শত শত নেতাকর্মী মেধা, শ্রম ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ত্যাগের পরিচয় দিয়েছে—গত সাত মাসে তাদের অবস্থান কোথায়? পটুয়াখালী কেন্দ্রিক গুটিকয়েক নেতাকর্মী ছাড়া সারা বাংলাদেশের গণঅধিকার পরিষদের কয়জন ত্যাগী কর্মী ন্যূনতম মূল্যায়ন বা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন?
২. অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক মাশুল: সরকারের অংশীদার হওয়ায় এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক জোটের সাথে থাকার কারণে সরকারের যাবতীয় ব্যর্থতা, অনিয়ম ও সিদ্ধান্তের জন্য জনগণের কাছ থেকে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদেরই সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ও ধিক্কার সহ্য করতে হচ্ছে। অর্থাৎ, সরকারে থাকার কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সুফল সাধারণ নেতাকর্মীরা পাচ্ছেন না, অথচ সরকারের সমালোচনা ও জনরোষের পুরোটাই তৃণমূল কর্মীদের বহন করতে হচ্ছে—যা রাজনীতিতে অত্যন্ত হতাশাজনক।
৩. জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নেতাদের ধরে রাখতে ব্যর্থতা: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এবং প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা গণঅধিকার পরিষদে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন কিংবা যুক্ত হয়ে নির্বাচন করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, দল এই ধরনের সম্ভাবনাময় ও জনাধিপত্য থাকা নেতাদের ধরে রাখতে বা যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি।
উদাহরণস্বরূপ, গোপালগঞ্জ-১ আসনের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কাবির মিয়ার কথা বলা যায়। তিনি কারাগার থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েও ৫৪,০০০-এর বেশি ভোট অর্জন করেছিলেন—যা দলের সভাপতি নুরুল হক নুরের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্জন।
এত বড় জনভিত্তি থাকা সত্ত্বেও এমন প্রভাবশালী নেতারা আজও আইনি জটিলতা বা কারাগারের প্রকোষ্ঠে দিন কাটাচ্ছেন, অথচ দল হিসেবে তাঁদের পাশে যেভাবে দাঁড়ানো বা আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া উচিত ছিল, তার তীব্র অভাব লক্ষ্য করা গেছে। যখন কোনো দল নিজের হেভিওয়েট ও গণভিত্তিসম্পন্ন নেতাদের নিরাপত্তা বা মূল্যায়ন দিতে পারে না, তখন নতুন করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এই দলে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
৪. সুদূরপ্রসারী নীতি ও সাংগঠনিক দর্শনের অভাব: একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দলকে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করার জন্য যে ধরনের সুনির্দিষ্ট নীতি ও কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, তার তীব্র অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব বিকাশ: প্রথম সারির নেতাদের পাশে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির সম্ভাবনাময় নেতাদের জাতীয়ভাবে পরিচিত করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
প্রচার ও যোগাযোগ: আধুনিক রাজনীতির উপযোগী শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া বা মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঘাটতি স্পষ্ট।
কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা: বেকার ও ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন বা কর্মসংস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
পুরো দলটি আজ তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি জাতীয় দলের চেহারার বদলে পটুয়াখালী কেন্দ্রিক একটি সীমিত রাজনৈতিক বলয়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে। দলটির উচ্চতর পরিষদ বা নীতিনির্ধারকরা এই বাস্তবতাকে কতটা উপলব্ধি করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
৫. সম্ভাবনাময় তরুণদের প্রস্থান ও এনসিপির উত্থান: আজকের ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি)-র দিকে তাকালে এই সাংগঠনিক ব্যর্থতার চিত্র আরও পরিষ্কার হয়। এনসিপির যে তরুণ তুর্কিরা আজ জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত লাভ করেছেন, যাদের মধ্যে কেউ সাবেক উপদেষ্টা কিংবা সংসদ সদস্য হিসেবে বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে জনগণের কাছাকাছি রয়েছেন—তাদের একটি বড় অংশ একসময় গণঅধিকার পরিষদ বা এর অঙ্গসংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দল সেই সম্ভাবনাময় নেতৃত্বকেও ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আজ স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তারা যদি তৎকালীন সময়ে নতুন পথ বেছে না নিতেন, তবে হয়তো রাজনীতিতে তাদের প্রতিভা ও জাতীয় পরিচিতি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেত না।
৬. ‘তৃতীয় শক্তি’ গঠনের স্বপ্ন বনাম আদর্শচ্যুত হওয়ার দ্বিধা: সীমাহীন সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নিয়েছিল পরিষদ। যখন বিএনপির মতো বৃহৎ শক্তি মাঠে দাঁড়াতে পারছিল না, জামায়াতের মতো সুসংগঠিত শক্তি নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় দিতে পারে নাই, তখন একঝাঁক মেধাবী সাহসী তরুণরা সীমাহীন দেশপ্রেমের স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিল। প্রশ্ন ওঠে—তাহলে কেন আজ তারা জনগণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার পথে? আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে ‘তৃতীয় শক্তি’র জন্ম দেওয়ার জন্যই তো সাধারণ মানুষ ও তরুণরা গণঅধিকার পরিষদের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিল; তাহলে কেন ঘুরেফিরে পরিবর্তনের কথা বলে আবার সেই পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বলয়ে বন্দি হয়ে পড়ল? এই কৌশলগত ভুল দলটিকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
উপসংহার: এই মূল্যায়ন কোনো অন্ধ বিরোধিতার জায়গা থেকে নয়, বরং দলের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং ত্যাগী কর্মীদের কষ্টের জায়গা থেকে উঠে এসেছে। রাজনীতিতে ‘শেষ’ বলে কিছু নেই এবং সময়মতো ভুল সংশোধন করতে পারলে ঘুরে দাঁড়ানো সর্বদা সম্ভব। গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত দ্রুত পটুয়াখালী কেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বের হয়ে তৃণমূলের ত্যাগী কর্মী ও আঞ্চলিক প্রভাবশালী নেতাদের মূল্যায়ন করা, দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব গড়ে তোলা, আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দলকে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
সময় গড়িয়ে যাওয়ার আগেই এই আত্মউপলব্ধিটুকু আসা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক
আপনার মতামত লিখুন