বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে ছয় মাসের সময়সীমা দিয়ে যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, তা গ্রহণ করে এরই মধ্যে সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি।
তিনি বলেন, এনসিপির আহ্বায়ক, সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে ৩০ দিন, ৬ থেকে ১৮ মাস এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাসহ মোট ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদে পাঁচটি, মধ্যমেয়াদে ছয়টি এবং দীর্ঘমেয়াদে চারটি প্রস্তাব রয়েছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আগেই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী চ্যালেঞ্জ দেওয়ার আগে এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করেননি। তাঁর মতে, সরকারের বিশাল মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদ থাকার পরও নাগরিক সমাজ ও বিরোধী দলের দেওয়া প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে না পৌঁছানো অত্যন্ত হতাশাজনক।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি নীতি, জ্বালানি পরিকল্পনা, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান এবং ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নিয়েও বিরোধী দলের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও এ বিষয়ে মতামত এসেছে। এসব বিষয় জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে এবং বিভিন্ন সেমিনারেও আলোচনা হয়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী মিলিয়ে সরকারের ৬২ জনের সভাসদ রয়েছে। কিন্তু তাঁদের একজনও যদি নাগরিক মতামত কিংবা বিরোধী দলের প্রস্তাবনা পর্যালোচনা না করে থাকেন, তাহলে সেটি শুধু নীতিগত ব্যর্থতা নয়, সরকারের টিমের কার্যকারিতা, সক্ষমতা ও যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
তিনি বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন আহ্বানের বিরোধী দলের দাবির প্রতিও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর ভাষায়, বিদ্যুৎ সংকটের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের উচিত বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করা এবং সংসদে এর সমাধান খোঁজা।
বিদ্যুৎ খাতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, গত ছয় মাসে প্রশাসনে ব্যাপক দলীয় পদায়নের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে জ্বালানি পরিকল্পনা, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট জায়গায় ভর্তুকি কমানো হলেও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো ব্যয় বহাল রয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালীর এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের পর রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুমোদিত ‘মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫’ বাস্তবায়নেরও দাবি জানান হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, এই কাঠামোর আওতায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা সরাসরি বড় শিল্প ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে। দুই পক্ষের মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ হবে এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিষয়টি অবহিত থাকবে। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন নেই।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূলত সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) এবং হুইলিং চার্জের কাঠামো চূড়ান্ত করাই বাকি। তাঁর দাবি, এটি কয়েক সপ্তাহের প্রশাসনিক কাজ; কোনো জটিল বা অসম্ভব বিষয় নয়।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ছয় মাসের সময়সীমা মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এই সময়ের হিসাব বিরোধী দলের নয়, সরকারের। মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়ন করতেই যদি ছয় মাসের বেশি সময় লাগে, তাহলে সেটি আর নীতিগত জটিলতা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকবে না; বরং তা সরকারের সক্ষমতার ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি হবে।
সরকারের নীতি নির্ধারণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রমাণিতভাবে ব্যর্থ মন্ত্রী ও অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে কৌশলগত খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বলা যায় না। এটি বরং ‘আই হ্যাভ নো প্ল্যান’-এর পরীক্ষা।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, একটি কার্যকর গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে আলটিমেটাম বা চ্যালেঞ্জ দেন না; বরং সরকার তার কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণ ও সংসদের কাছে জবাবদিহি করে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার ছয় মাস ক্ষমতায় থাকার পরও দেশ কেন ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হলো এবং কেন রাষ্ট্র অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।
সবশেষে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “সমাধান আমাদের হাতে আছে। কিন্তু ক্ষমতা আপনার হাতে। ছয় মাস পর জনগণ জানতে চাইবে—দুটোর মধ্যে কোনটির অভাবে দেশ অন্ধকারে ছিল।”

দেশজামানা ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ । ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ