ডিজিটাল পর্দার আড়ালে: তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পর্নোগ্রাফির চ্যালেঞ্জ

শিকদার বাসির
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬ । ৮:০২ অপরাহ্ণ

ডিজিটাল প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানবসভ্যতাকে যেমন জ্ঞান, যোগাযোগ ও উদ্ভাবনের নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছে, তেমনি উন্মোচন করেছে এমন কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ, যার প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ—সব ক্ষেত্রেই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এমন এক ডিজিটাল পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমনির্ভর কনটেন্ট প্রবাহের কারণে যৌন উদ্দীপনামূলক ও অশ্লীল কনটেন্টে পৌঁছানো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়ে গেছে। ফলে বিষয়টি আর কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, শিশু-কিশোরের মানসিক বিকাশ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি সাতজন ১০–১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। একই সঙ্গে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, ডিজিটাল পরিবেশ তরুণদের জন্য যেমন শিক্ষা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সংযোগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনি ক্ষতিকর কনটেন্ট, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অনলাইন ঝুঁকির মতো নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। ফলে তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে আলোচনা করতে হলে ডিজিটাল পরিবেশের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় দিককেই সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।

সহজলভ্যতার ডিজিটাল বাস্তবতা

একসময় পর্নোগ্রাফি বা অশ্লীল কনটেন্টে প্রবেশ ছিল সীমিত এবং তুলনামূলকভাবে কঠিন। বর্তমানে সেই বাস্তবতা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। স্মার্টফোনের ব্যাপক বিস্তার, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, ব্যক্তিকেন্দ্রিক অ্যালগরিদম এবং স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট সুপারিশ ব্যবস্থা মিলিয়ে এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে একজন ব্যবহারকারীর সামান্য কৌতূহলও খুব অল্প সময়ের মধ্যে একই ধরনের কনটেন্টের ধারাবাহিক প্রবাহে রূপ নিতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক কাঠামো মূলত ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার ওপর নির্ভরশীল। ফলে যেসব কনটেন্ট দীর্ঘ সময় দর্শককে স্ক্রিনে আটকে রাখতে সক্ষম, অ্যালগরিদম সেগুলোকেই তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেয়। এই বাস্তবতায় বয়স-অনুপযোগী বা যৌন উদ্দীপনামূলক কনটেন্ট অনেক সময় প্রত্যক্ষ অনুসন্ধান ছাড়াই ব্যবহারকারীর সামনে চলে আসে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে, যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিক সক্ষমতা এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়নি, এ ধরনের পুনরাবৃত্ত কনটেন্ট দীর্ঘমেয়াদে তাদের আচরণ, চিন্তাভাবনা ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে ডিজিটাল গোপনীয়তার অনুভূতি। ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, একক ব্যবহার এবং অভিভাবকীয় তদারকির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কিশোর-কিশোরী এমন কনটেন্টের সংস্পর্শে আসে, যা তাদের বয়স, মানসিক পরিপক্বতা কিংবা আবেগীয় বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিষয়টি তাই কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; এটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: গবেষণা কী বলছে

কৈশোর এমন একটি সময়, যখন মানুষের শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আত্মসংযমের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলোরও দ্রুত বিকাশ ঘটে। স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, এই সময়ে মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থা (reward system) তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল থাকে, অথচ দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলোর পূর্ণ বিকাশ তখনও সম্পন্ন হয় না। ফলে অতিরিক্ত উদ্দীপনামূলক ডিজিটাল কনটেন্টের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে একই ধরনের কনটেন্ট সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না; ব্যক্তির পারিবারিক পরিবেশ, মানসিক অবস্থা, সামাজিক সহায়তা, ব্যক্তিত্ব এবং ব্যবহারের ধরন—সবকিছু মিলিয়েই এর প্রভাব নির্ধারিত হয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প বয়সে পর্নোগ্রাফির নিয়মিত সংস্পর্শ কিছু ক্ষেত্রে মনোযোগের ঘাটতি, পড়াশোনায় অনাগ্রহ, ঘুমের ব্যাঘাত, উদ্বেগ, বিষণ্নতার উপসর্গ এবং বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে শরীর সম্পর্কে অবাস্তব প্রত্যাশা, আত্মসম্মানবোধের অবনতি এবং নিজের চেহারা বা শারীরিক গঠন নিয়ে অপ্রয়োজনীয় অসন্তোষও তৈরি হতে পারে। যদিও এসব সম্পর্কের পেছনে একাধিক সামাজিক ও মানসিক কারণ কাজ করে, তবু বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পর্নোগ্রাফি প্রায়ই মানবিক সম্পর্ককে বাস্তবতার পরিবর্তে কৃত্রিম ও বাণিজ্যিক উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরে। ফলে কিশোর-কিশোরীদের একটি অংশের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মতি, দায়িত্ববোধ ও আবেগনির্ভর সম্পর্কের পরিবর্তে অবাস্তব প্রত্যাশা গড়ে উঠতে পারে। বাস্তব জীবনের সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহমর্মিতা ও দায়িত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে; কিন্তু অনলাইন কনটেন্ট সেই বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। এ কারণে কিছু তরুণের মধ্যে সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা এবং যৌনতা সম্পর্কে বিভ্রান্ত ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা (UNICEF)ও সতর্ক করেছে যে, অনলাইনে ক্ষতিকর যৌন কনটেন্টে শিশু ও কিশোরদের সহজ প্রবেশাধিকার তাদের মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং সার্বিক বিকাশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সংস্থাটি বিশেষভাবে জোর দিয়েছে ডিজিটাল সাক্ষরতা, বয়সোপযোগী সুরক্ষা ব্যবস্থা, অভিভাবকীয় সম্পৃক্ততা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর। অর্থাৎ সমস্যাটিকে কেবল ব্যক্তিগত আচরণের প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং শিশু অধিকার, জনস্বাস্থ্য ও ডিজিটাল নিরাপত্তার সমন্বিত ইস্যু হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—পর্নোগ্রাফি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একাই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ নয়। মানসিক সুস্থতা নির্ভর করে পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনসহ বহু উপাদানের ওপর। কিন্তু যখন ক্ষতিকর কনটেন্টে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, দীর্ঘ সময়ের অনলাইন নির্ভরতা এবং মানসিক সহায়তার অভাব একসঙ্গে কাজ করে, তখন ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। তাই সমস্যাটিকে অস্বীকার করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি এটিকে অতিরঞ্জিত করাও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

সামাজিক নীরবতা: অদৃশ্য সংকটের বিস্তার

বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় যৌনতা, মানসিক স্বাস্থ্য কিংবা অনলাইন ঝুঁকি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনও অনেকাংশে সংকোচ ও ট্যাবুর আড়ালে রয়ে গেছে। ফলে অনেক কিশোর-কিশোরী ও তরুণ তাদের কৌতূহল, বিভ্রান্তি কিংবা মানসিক অস্বস্তির বিষয়ে পরিবার, শিক্ষক বা পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে ইন্টারনেটকেই প্রধান তথ্যসূত্র হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু অনলাইন জগতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর, বাণিজ্যিক ও ক্ষতিকর কনটেন্টও সমানভাবে উপস্থিত। ফলে সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে ভুল ধারণা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলে সামাজিক কলঙ্কের সংস্কৃতি। অনেক তরুণ মনে করে, এ ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বললে তাকে বিচার করা হবে বা অপমানের মুখে পড়তে হবে। আবার অনেক অভিভাবকও বিব্রতবোধ বা অজ্ঞতার কারণে সন্তানদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা এড়িয়ে যান। এই পারস্পরিক নীরবতা সমস্যার সমাধান করে না; বরং তা আরও গভীরে প্রোথিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীন ও বিশ্বাসভিত্তিক পারিবারিক যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

করণীয়: সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ কৌশল

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ।

পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বয়সোপযোগী, খোলামেলা এবং সম্মানজনক সংলাপের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই প্রশ্ন করতে এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাইতে পারে। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও ডিজিটাল প্রযুক্তি, অনলাইন ঝুঁকি এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নয়, ডিজিটাল সাক্ষরতা, মিডিয়া লিটারেসি, অনলাইন নিরাপত্তা, সম্মানজনক সম্পর্ক, এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি–ভিত্তিক শিক্ষা আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে শেখানোও ততটাই জরুরি।

অন্যদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। বয়সভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও সীমিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং শিশু-কিশোরদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের উচিত এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা, যা একদিকে শিশু ও তরুণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মতো মৌলিক অধিকারও সম্মান করবে।

সবশেষে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং কলঙ্কমুক্ত করা অপরিহার্য। তরুণদের জন্য বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাউন্সেলিং সেবা সম্প্রসারণ, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং প্রয়োজনে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হলে অনেক সমস্যাই প্রাথমিক পর্যায়ে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

নীতিনির্ধারণে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

ডিজিটাল যুগের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভয়, আতঙ্ক বা নিষেধাজ্ঞা একমাত্র সমাধান নয়। প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক নীতি, ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা এবং পরিবার-বিদ্যালয়-রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ। তরুণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং সুস্থ মানসিক বিকাশের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একটি নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং মানবিক মূল্যবোধ—দুটির মধ্যে সুষম সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

 উপসংহার

ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের সময়ের অনিবার্য বাস্তবতা। তাই সমাধান প্রযুক্তিকে ভয় করা বা অস্বীকার করার মধ্যে নয়; বরং এর ব্যবহারকে আরও সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক করে তোলার মধ্যেই নিহিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষা, সৃজনশীলতা, জ্ঞানচর্চা ও বৈশ্বিক যোগাযোগের অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো এমন কিছু ঝুঁকিও সামনে এনেছে, যা উপেক্ষা করলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পর্নোগ্রাফি ও ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্টের প্রশ্নে তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ, তথ্যনির্ভর এবং মানবিক। একদিকে তরুণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে তাদের কৌতূহল, মানসিক বিকাশ এবং তথ্যপ্রাপ্তির প্রয়োজনকেও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। ভয়ভিত্তিক প্রচারণা কিংবা কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক সচেতনতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, পারিবারিক সংলাপ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর জবাবদিহিতা।

সবচেয়ে বড় কথা, তরুণদের আমরা কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ সমাজের নির্মাতা হিসেবেও দেখি। তাদের মানসিক সুস্থতা, মূল্যবোধ, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং নিরাপদ ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—প্রত্যেকের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

একটি সভ্য সমাজের শক্তি কেবল তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়, বরং সেই প্রযুক্তিকে কতটা মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করে। আজ আমরা যদি গবেষণাভিত্তিক নীতি, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি, তবে আগামী প্রজন্ম শুধু প্রযুক্তিতে দক্ষই হবে না; তারা হবে মানসিকভাবে সুস্থ, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ নাগরিক। সেই লক্ষ্যেই আমাদের আজকের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত আরও দূরদর্শী, আরও সমন্বিত এবং আরও দায়িত্বশীল।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ছড়াকার ও গীতিকবি, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহফুজ ইকরাম

প্রিন্ট করুন