উৎসগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভাষাগত ফ্যাসিবাদ রোধে ঢাকাইয়া উর্দুর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভাষাগত ফ্যাসিবাদ বলতে যখন কোনো ভাষাকে রাজনীতি, অর্থনীতি, শোষণ, শাসন, ধর্ম বা বর্ণভেদে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ঢাকাইয়া উর্দু এই বৈষম্যের বিপরীতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান তৈরি করে । একে নিচের পয়েন্টগুলোর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যায়:
মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা: উৎস অনুযায়ী, ঢাকাইয়া উর্দু পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দাদের একটি স্বতন্ত্র মাতৃভাষা। ভাষাগত ফ্যাসিবাদ সাধারণত ছোট বা আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে অবদমন করতে চায়, কিন্তু ঢাকাইয়া উর্দুর অস্তিত্ব এবং এর চর্চা এই দাবির প্রতিফলন ঘটায় যে, প্রতিটি শিশুর নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষা ও ভাব প্রকাশের সমান অধিকার রয়েছে ।
ভাষাগত বৈচিত্র্যের সুরক্ষা: ঢাকাইয়া উর্দুকে বাংলাদেশের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা যেমন—সিলেটি, চাটগাঁইয়া বা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার কাতারে দেখা হয় । এই দৃষ্টিভঙ্গিটি নির্দেশ করে যে, কেবল প্রমিত ভাষা নয়, বরং সব ভাষা ও উপভাষার প্রস্ফুটিত হওয়ার অধিকার আছে, যা একচ্ছত্র আধিপত্য বা ভাষাগত ফ্যাসিবাদের পরিপন্থী।
দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রেমের বন্ধন: ঢাকাইয়া উর্দুর লক্ষ্য হলো মানুষে-মানুষে দ্বন্দ্ব ও বিভাজন দূর করে প্রেম-ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করা । যেখানে ভাষাগত ফ্যাসিবাদ ভাষাকে শোষণের হাতিয়ার বানাতে চায়, সেখানে ঢাকাইয়া উর্দু নিজেকে একটি মানবিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করে ।
সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন ও অভিধানের ভূমিকা: ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘বাংলা-ঢাকাইয়া উর্দু অভিধান’ ভাষাগত আদান-প্রদানকে সহজ করে তুলেছে । এটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে ভাষাগত দূরত্ব কমিয়ে আনে এবং ভাষার সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করে, যা কোনো নির্দিষ্ট ভাষার একক আধিপত্যের দেয়াল ভেঙে দেয়।
ঐতিহাসিক বিবর্তন বনাম একক আধিপত্য: প্রমিত উর্দুর একটি আঞ্চলিক উপভাষা হিসেবে ঢাকাইয়া উর্দুর টিকে থাকা প্রমাণ করে যে, ভাষা স্থির বা একক কোনো সত্তা নয়, বরং এটি আঞ্চলিক প্রভাবে বিবর্তিত হতে পারে । এই যে ‘আঞ্চলিক রূপ’ বা ‘বোলি’ (Dialect) গ্রহণ করা, তা কোনো নির্দিষ্ট প্রমিত রূপ চাপিয়ে দেওয়ার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরোধ।
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকাইয়া উর্দুর চর্চা ও স্বীকৃতি কেবল একটি ভাষার টিকে থাকা নয়, বরং এটি ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা এবং সব মানুষের নিজ ভাষায় কথা বলার গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতীক।
লেখক: কলামিস্ট ও ঢাকাইয়া উর্দু বিশেষজ্ঞ

নাজির উদ্দিন ঢাকাইয়া
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ । ৯:২২ পূর্বাহ্ণ