বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার তরুণ শিক্ষার্থীরা সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ইংরেজি ভাষার মতো আধুনিক দক্ষতা অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব এবং প্রবীণ বা চিন্তাভাবনায় পিছিয়ে পড়া নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতার কারণে এই নবীনরা নানা বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে।
এই অনাগ্রহ ও সহায়তাহীনতার পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে :
- ঐতিহ্যগত কারিকুলাম ও ভাবাদর্শ রক্ষা:
শতাব্দীপ্রাচীন ‘দারসে নিজামী’ কারিকুলামকে অপরিবর্তিত রাখার রক্ষণশীল মানসিকতাই এখানে অন্যতম প্রধান বাধা। প্রবীণ দায়িত্বশীলদের অনেকের আশঙ্কা, আধুনিক বা কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলে দ্বীনি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ও ধর্মীয় বিশুদ্ধতা ব্যাহত হতে পারে।
- বাস্তবতার সাথে বিচ্ছিন্নতা :
কওমি ধারার মুরুব্বিদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রধানত ইমামতি, খতিব বা মাদ্রাসা শিক্ষকতার মতো ঐতিহ্যবাহী পেশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শ্রমবাজারের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতা এবং সামাজিক অর্থনীতিতে শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্ট (বাস্তবিক অর্থে কোনো পরিকল্পনা নাই বললেই চলে)।
- অবকাঠামো ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা :
কওমি মাদ্রাসাগুলো মূলত দান-অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টারনেট বা আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে বেশ চ্যালেঞ্জিং। এবং এর থেকে উত্তরণের কোনো চিন্তাভাবনা শায়েখদের নাই।
- নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার আশঙ্কা :
প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষায় দক্ষ হয়ে তরুণরা স্বাবলম্বী হলে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন শিথিল হয়ে যেতে পারে—কর্তৃপক্ষের মধ্যে এমন একটি আশঙ্কাও কাজ করে।
এর ফলে ব্যক্তিগত চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কওমি ধারার বহু সম্ভাবনাময় তরুণ পেশাগত জীবনে অনিশ্চয়তা ও বেকারত্বের মুখোমুখি হচ্ছে। কওমি শিক্ষার মূল কাঠামোর সাথে যুগোপযোগী দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো ছাড়া এই সংকট দূর করা সম্ভব না।
তবে আশাব্যঞ্জক দিকও একেবারে নাই তা না। দেশের কিছু অগ্রসর কওমি মাদ্রাসা এবং আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প পথ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে—কোথাও কোথাও আইটি বা ইংরেজি ভাষার ক্লাস চালু হয়েছে, কেউ কেউ অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের সাথেও যুক্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। এই বিক্ষিপ্ত প্রচেষ্টাগুলোকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও কাঠামোগত সহায়তার মধ্যে আনা যায়, তাহলে দ্বীনি শিক্ষার মূল চেতনা অক্ষুণ্ন রেখেই কওমি ধারার তরুণদের জন্য একটি টেকসই ও আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
- লেখক: কবি ও বিশ্লেষক

আবু বকর চৌধুরী
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬ । ৩:১১ অপরাহ্ণ