শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা হবে

দেশজামানা ডেস্ক:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬ । ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিচার এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার দাবিতে জাতীয় সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে দলগত বিচারের দাবি জানান সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই; বাংলাদেশের সীমানায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুসারে আলোচনার এ নোটিশটি উত্থাপন করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই। তিনি দেশে ফিরলেই গ্রেপ্তার করা হবে। এ সময় একই সুরে কথা বলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, যারা আত্মসমর্পণ করার হুংকার দিচ্ছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তাদের আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ থাকবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাংলাদেশের সীমানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার হবেন। এটি সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার।

তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে। এরই মধ্যে চারটি মামলার চার্জ গঠন এবং তিনটির রায় ঘোষণা করা হয়েছে। কুখ্যাত শাপলা চত্বরের নারকীয় হত্যাকাণ্ডেরও তদন্ত শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে সংসদে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুতগতিতে চলছে। বর্তমানে ৫৯০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং ১২টি মামলার তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তার সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।

আওয়ামী লীগের দলগত বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি শুরু থেকেই এ দাবিতে সোচ্চার ছিল। পরবর্তী সময়ে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলগত বিচারের আইনি ভিত্তিও তৈরি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য এখনো পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে। তিনি বিরোধী দলকে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র ও সীমান্ত নীতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে। সরকারের মূল নীতি হচ্ছে—সবার আগে বাংলাদেশ। মনে রাখতে হবে, আপনি চাইলে বউ বদল করতে পারবেন; কিন্তু প্রতিবেশী বদল করতে পারবেন না। এ ছাড়া আগামী ৫ আগস্ট ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করা হবে বলে তিনি জানান।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল সাড়ে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত ফল। এ দীর্ঘ সময়ে যারা গুম, খুন ও পঙ্গু হয়েছেন, তাদের ভুলে যাওয়া নিজের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো গড়িমসি জাতি সহ্য করবে না।

তিনি গণমাধ্যমের একাংশের সমালোচনা করে বলেন, বেশিরভাগ মিডিয়া স্বৈরাচারকে ভয়ংকর হতে সাহায্য করেছিল। তারা এখন আবার পানি ঘোলা করার জন্য মাঠে নেমেছে। সরকার তাদের ব্যাপারে কেন দুর্বলতা দেখাচ্ছে, তা আমরা জানতে চাই। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সীমান্তে সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, এটি একটি স্বাধীন দেশ এবং এর প্রতিটি বালুকণা আমরা পাহারাদারি করব।

এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় মিডিয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছিল। দুঃখের বিষয়, সরকারি দলেরও দু-একজন সদস্য টকশোতে জুলাইয়ের শহীদদের সঙ্গে পুলিশের তুলনা করছেন, যা আওয়ামী লীগেরই বয়ান। তিনি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমকে আরও দক্ষ করার দাবি জানান।

নোটিশ উত্থাপনকারী আখতার হোসেন বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। অবিলম্বে শেখ হাসিনাসহ খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের বিতর্কিত সরকারের নীল নকশা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চক্রান্তে দেশে একটি ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হয়েছিল। ভবিষ্যতে যেন কোনো শক্তি এমন গণহত্যা চালাতে না পারে, সেজন্য রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার অনিবার্য।

আলোচনায় অন্যদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম ও রোকেয়া বেগম অংশ নিয়ে অবিলম্বে জুলাই গণহত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহফুজ ইকরাম

প্রিন্ট করুন